সোমবার জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া কর্তৃপক্ষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে সম্মত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংশ্লিষ্ট নির্দেশ সংশোধনের দাবি জানালেন আন্দোলনরত পড়ুয়াদের একাংশ। উপাচার্য মাজহার আসিফকে চিঠি দিয়ে তাঁরা জানিয়েছেন, তাঁদের দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে মেটানো হয়নি।
পড়ুয়াদের আপত্তি মূলত তিনটি বিষয়ে। প্রথমত, ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্র অনুমোদনের কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্দেশে বেঁধে দেওয়া হয়নি। দ্বিতীয়ত, যাঁদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তাঁদের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। এই পড়ুয়াদের মধ্যে অনশনকারীরাও রয়েছেন। তৃতীয়ত, আন্দোলনের সময়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে করা ‘মানহানিকর মন্তব্য, কার্যকলাপ ও পোস্ট’-এর জন্য পড়ুয়ারা প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইবেন বলে নির্দেশে একটি অঙ্গীকারের উল্লেখ রয়েছে। আন্দোলনকারীরা এমন অঙ্গীকার করতে অস্বীকার করেছেন।
১২ অক্টোবর থেকে অনশনে বসা পাঁচ পড়ুয়ার মধ্যে দু’জন জানিয়েছেন, নির্দেশের অস্পষ্টতার কারণে তাঁরা অনশন চালিয়ে যাবেন। তাঁদের বক্তব্য, ছাত্র সংসদ গঠনের কোনও সুস্পষ্ট সময়সীমা এই নির্দেশে নেই।
দু’সপ্তাহ ধরে চলা আন্দোলনের মধ্যে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মীদের সংঘর্ষও হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সোমবার ভোরে কর্তৃপক্ষ নির্দেশ জারি করে জানায়, ‘জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্র অনুমোদনের তারিখ থেকে ১৫ দিন পরে’ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
নির্দেশে আরও দু’টি আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনের সময়ে পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে জারি করা সাসপেনশন ও কারণ দর্শানোর নোটিস প্রত্যাহার করা হবে। পাশাপাশি, আন্দোলন চলাকালীন নিরাপত্তাকর্মীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।
আন্দোলনকারী পড়ুয়ারা চাইছেন, ২০ ডিসেম্বরের মধ্যে ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্রের খসড়া তৈরি ও অনুমোদন সম্পন্ন করার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দিক কর্তৃপক্ষ। তার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হবে। আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা—কারণ দর্শানোর নোটিস, সাসপেনশন, ক্যাম্পাসে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা এবং বহিষ্কার—প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা। সেই সঙ্গে প্রধান নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা।
আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক লুবাইব বশির বলেন, “গঠনতন্ত্র তৈরির প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন ঘোষণার নির্দিষ্ট সময়সীমা কর্তৃপক্ষ যত দিন না জানাচ্ছে এবং আমাদের অন্যান্য দাবি পূরণ করছে, তত দিন আন্দোলন চলবে।”
অনশনরত পড়ুয়াদের অন্যতম এবিন বাসিল নির্দেশের ফাঁকগুলি তুলে ধরে বলেন, “নির্দেশে সাসপেনশন এবং কারণ দর্শানোর নোটিসের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু যাঁদের ক্যাম্পাসে ঢোকা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বহিষ্কার করা হয়েছে, তাঁদের কী হবে? অনশনকারীদেরও ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বহিষ্কার করা হয়েছে।”
আন্দোলনের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে করা কোনও ‘মানহানিকর মন্তব্য, কার্যকলাপ বা পোস্ট’-এর জন্য পড়ুয়ারা সাংবাদিক বৈঠক করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইবেন—এমন একটি অঙ্গীকারও নির্দেশে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে লুবাইব বলেন, “শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের জন্য আমরা ক্ষমা চাইব না।”
বর্তমান আন্দোলনের মূল দাবি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ছাত্র সংসদ বা জেএমআইএসইউ পুনরুজ্জীবিত করা। ২০০৬ সালে সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। তার পর থেকে সেটি আর পুনর্গঠিত হয়নি। সম্প্রতি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ অনশনের পরে কর্তৃপক্ষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে সম্মত হওয়ায় জামিয়ার আন্দোলনও গতি পায়।
২১ অক্টোবর জামিয়া কর্তৃপক্ষ ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্রের খসড়া তৈরির জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের বিজ্ঞপ্তি জারি করে। সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক জুবের মিনাইয়ের নেতৃত্বাধীন এই কমিটিকে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া আইন, ১৯৮৮-এর ২৩ ধারার জে ও কে উপধারা অনুযায়ী খসড়া তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন অধ্যাপক লোকমান আহমদ খান, অধ্যাপক আসলাম খান এবং অধ্যাপক এম অমরজিৎ সিংহ। ছাত্রকল্যাণ বিভাগের ডিন অধ্যাপক নিলোফার আফজল রয়েছেন সদস্য-আহ্বায়ক হিসেবে।
২০০৬ সালে কী পরিস্থিতিতে ছাত্র সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, প্রাসঙ্গিক আদালতের রায় এবং লিংডো কমিটির সুপারিশ খতিয়ে দেখবে এই কমিটি। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পড়ুয়াসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ২০ ডিসেম্বরের মধ্যে গঠনতন্ত্রের খসড়া জমা দেওয়া হবে। কিন্তু আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, খসড়া অনুমোদনের নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়াই অনিশ্চিত থেকে যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আধিকারিক জানান, ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্র তৈরির সময়ে সংশ্লিষ্ট আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো বিবেচনায় রাখতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে লিংডো কমিটির সুপারিশ এবং প্রাসঙ্গিক আদালতের নির্দেশ। পাশাপাশি, ২০০৬ সালে সংসদ ভেঙে দেওয়ার প্রেক্ষাপটও খতিয়ে দেখবে কমিটি।
ওই আধিকারিক বলেন, “একটি ছাত্র সংসদ কোন নিয়ম, বিধি, উপবিধি ও প্রবিধান মেনে কাজ করবে, তা গঠনতন্ত্রে নির্ধারিত হয়। তাড়াহুড়ো করে তা তৈরি করা যায় না। প্রায় ২০ বছর ধরে ছাত্র সংসদ অকার্যকর রয়েছে। এই সময়ে ছাত্ররাজনীতি এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর পরিবর্তন হয়েছে। গঠনতন্ত্র যাতে জামিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উপযোগী হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রযোজ্য নিয়ম মেনে তৈরি হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এর পরে আমরা ভোটার তালিকা তৈরি করব, তার পর নির্বাচন ঘোষণা করা হবে। প্রতিটি কাজের একটি প্রক্রিয়া আছে। একটি নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।”